

যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত এবং ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোর আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে ঢাকায় পৌঁছাবেন বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে। তিন দিনের এ সফর নতুন বিএনপি সরকারের সময়ে কোনো সিনিয়র মার্কিন কূটনীতিকের প্রথম সফর হিসেবে গণ্য হচ্ছে। কূটনৈতিক মহল এ সফরকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির গতিপথ যাচাইয়ের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, ঢাকায় পৌঁছানোর পর আজ সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করবেন সার্জিও গোর। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর রাতে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের বাসভবনে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গেও বৈঠকের কথা রয়েছে সার্জিও গোরের। আগামীকাল শুক্রবার সার্জিও গোর কক্সবাজার সফর করবেন এবং রোহিঙ্গা শরণার্থীদের কয়েকটি ক্যাম্প সরেজমিন পরিদর্শন করবেন। সফরের শেষ দিন শনিবার সকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সার্জিও গোরের বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। এরপর দুপুরে তিনি ঢাকা ত্যাগ করবেন। সার্জিও গোরের ঢাকা সফর প্রসঙ্গে ঢাকাস্থ যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গোরের বাংলাদেশে আসার বিষয়টি রুটিন সফরের অংশ। গতকাল পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘ম্যানিলায় সার্জিও গোরের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে। আমরা দুই দেশের সম্পর্ক রিভিউ করেছি। আমেরিকার সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক বহুমাত্রিক। তারাও চাইছেন সম্পর্কটা আরও এগিয়ে নিতে।’ তিনি আরও বলেন, ‘উনি শুধু ভারতে আমেরিকার রাষ্ট্রদূত নন, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক প্রতিনিধি। বাংলাদেশে তার এটি প্রথম সফর। এ সফরে তিনি বাংলাদেশ সম্পর্কে বুঝতে চাইবেন। অনেক স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে কথাবার্তা বলবেন। আমাদের রোহিঙ্গা সমস্যা সম্পর্কে তিনি অবগত আছেন।’ রোহিঙ্গা ইস্যুতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘সব বৈদেশিক সাহায্য আমরা যা পেয়েছি, আন্তর্জাতিকভাবে তাদের আমরা ধন্যবাদ দিচ্ছি। এর মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্যের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি এবং এটি আমরা ধন্যবাদের সঙ্গে স্মরণ করি। তিনি (সার্জিও গোর) রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনে যাবেন।’ পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ এ দূত দুদেশের পারস্পরিক সম্পর্কের প্রধান প্রধান দিক বোঝার চেষ্টা করবেন। এটি গোরের জন্য উপলব্ধিমূলক সফর।’ গোরের সফর নিয়ে কেন এত আলোচনা: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফরের পর সার্জিও গোরের বাংলাদেশ সফরের বিষয়টি ঘিরে নানা আলোচনা চলছে। অনেকেই ভাবছেন, গোরের সফরে ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক, বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ নিয়ে আলোচনা হতে পারে। তবে কূটনৈতিক সূত্রগুলো এ সফরকে নিয়মিত সফরের অংশ হিসেবেই দেখছেন। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, সফরে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং রোহিঙ্গা সংকটসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আলোচনায় উঠে আসতে পারে। সম্প্রতি দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক বাণিজ্য ব্যবস্থা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। এসব বিষয় সফরে আরও গভীরভাবে পর্যালোচনা হতে পারে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বাংলাদেশ বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত সম্পর্ক ও বাণিজ্য বাড়ছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঐতিহ্যগত সম্পর্ক ধরে রাখার চেষ্টাও চলছে। এমন পরিস্থিতিতে সার্জিও গোরের সফর ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের অবস্থান যাচাইয়েরই একটি পদক্ষেপ। একই সঙ্গে নতুন সরকারের ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির আওতায় দেশের পররাষ্ট্রনীতি বোঝার চেষ্টাও এ সফরের অন্যতম উদ্দেশ্য। এদিকে বাংলাদেশ সরকার এ সফরকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও গভীর করার সুযোগ হিসেবে দেখছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম এর আগে বলেছেন, বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক সবসময়ই ভালো ছিল এবং বর্তমান সরকারের আমলে তা আরও শক্তিশালী হচ্ছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সার্জিও গোরের এ সফরের মাধ্যমে বাণিজ্য, অর্থনৈতিক কূটনীতি ও জনগণের মধ্যে যোগাযোগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়বে। চীন সফরে মোংলা বন্দর আধুনিকায়ন, তিস্তা প্রকল্প, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং চট্টগ্রামে চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলসহ বেশকিছু বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। ওয়াশিংটন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকার, আঞ্চলিক কৌশলগত অবস্থান এবং চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা স্পষ্টভাবে বুঝতে চায় বলছেন বিশ্লেষকরা। উল্লেখ্য, সার্জিও গোর ১৯৮৬ সালে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের উজবেকিস্তানের তাসখন্দে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত। আগে তিনি হোয়াইট হাউসের প্রেসিডেন্সিয়াল পার্সোনেল অফিসের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২৫ সালের আগস্টে তাকে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত এবং ভারতে রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তিনি চলতি বছরের জানুয়ারিতে নয়াদিল্লিতে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ট্রাম্প প্রশাসনের প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে তার এ সফর আরও বেশি মনোযোগ আকর্ষণ করেছে