

বৈরী আবহাওয়া ও অস্বাভাবিক জোয়ারে নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার চরঈশ্বর, নলচিরা, চরকিং ও সোনাদিয়া ইউনিয়নের বেড়িবাঁধের বিভিন্ন অংশের প্রায় ৮০০ মিটার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কয়েকটি স্থানে বাঁধ ভেঙে প্লাবিত হয়েছে একাধিক গ্রাম। দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত অংশ মেরামত করা না হলে আগামী পূর্ণিমার জোয়ার ও বর্ষার শেষ দিকে চার ইউনিয়নের লক্ষাধিক মানুষ আবারও প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ায় প্রায় সাড়ে সাত লাখ মানুষের বসবাস। ঝড়-জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন ও নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করেই তাদের জীবনযাপন। চলতি বর্ষার শুরুতেই টানা ভারী বৃষ্টি এবং মেঘনা নদী ও বঙ্গোপসাগরের অস্বাভাবিক জোয়ারে উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে কয়েক লাখ মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করেন। এ পরিস্থিতির মধ্যেই অস্বাভাবিক জোয়ারে ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধ উপকূলবাসীর মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। কোথাও কোথাও বাঁধ এতটাই সরু ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে যে, সামনের পূর্ণিমার জোয়ার কিংবা কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতেই তা ভেঙে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। ফলে চারটি ইউনিয়নের নদীতীরবর্তী এলাকার হাজারো পরিবার প্রতিদিন উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। অনেকেই আগাম প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র নিরাপদ স্থানে সরিয়ে রাখছেন, আবার কেউ কেউ স্বজনদের বাড়িতে আশ্রয় নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। অতীতের জলোচ্ছ্বাস ও প্লাবনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা তাদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। নলচিরা ইউনিয়নের তুপানিয়া গ্রামের বেড়িবাঁধসংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা রোকেয়া বেগম বলেন, জোয়ারের ঢেউয়ের আঘাতে তাদের এলাকার বাঁধটি খুবই সরু হয়ে গেছে। যে কোনো সময় এটি ভেঙে যেতে পারে। বাঁধ ভেঙে গেলে তাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই থাকবে না। আক্ষেপ করে তিনি বলেন, আমরা ভোট দিয়ে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত করেছি। এখন আমাদের দেখার যেন কেউ নেই। তারা ঢাকায় অবস্থান করছেন, আর আমরা দিন-রাত পানিতে ভেসে যাওয়ার আতঙ্কে কাটাচ্ছি। একই এলাকার বাসিন্দা আব্দুল খালেক বলেন, রাতে জোয়ারের পানির স্রোতের শব্দে ঘুম আসে না। মনে হয়, এই বুঝি বেড়িবাঁধ ভেঙে গেল। আতঙ্কে পরিবারের অনেক সদস্য অন্যত্র অবস্থান করছেন। বাড়ির প্রয়োজনীয় আসবাবপত্রও নিরাপদ স্থানে সরিয়ে রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, বর্তমানে কাটাল শেষ হলেও সামনে পূর্ণিমার জোয়ারে ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ টিকে থাকা কঠিন হবে। তাই নলচিরা ইউনিয়নের উত্তর পাশের চারটি ক্ষতিগ্রস্ত স্থানে জরুরি ভিত্তিতে মেরামতের দাবি জানান তিনি। কয়েক দিন আগে স্বাভাবিকের তুলনায় চার থেকে পাঁচ ফুট উচ্চতার জোয়ারে চরঈশ্বর ইউনিয়নের আফাজিয়া এলাকায় প্রায় ৩০ মিটার বেড়িবাঁধ ভেঙে তিনটি গ্রাম প্লাবিত হয়। চরঈশ্বর ইউনিয়নের বাসিন্দা নিপু খিলজী বলেন, ভেঙে যাওয়া অংশটি পানি উন্নয়ন বোর্ড জরুরি ভিত্তিতে জিওব্যাগ ফেলে মেরামত করেছে। তবে পাশের ঝুঁকিপূর্ণ অংশ এখনো সংস্কার করা হয়নি। কোথাও কোথাও মাত্র এক ফুটের মতো বাঁধ অবশিষ্ট রয়েছে, যা স্থানীয়দের মধ্যে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। একই চিত্র সোনাদিয়া ইউনিয়নের পশ্চিম সোনাদিয়া গ্রামেও। স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল মন্নান রানা জানান, গ্রামের মানুষ নিজ উদ্যোগে গাছের গুঁড়ি, ডালপালা ও মাটিভর্তি বস্তা দিয়ে বাঁধটি কোনোভাবে টিকিয়ে রেখেছেন। কিন্তু আগামী পূর্ণিমার জোয়ারে সেটি আর ধরে রাখা সম্ভব হবে না। বাঁধ ভেঙে গেলে ফসলি জমি, মাছের ঘের, বসতঘর, সড়ক, গবাদিপশু ও বিভিন্ন স্থাপনার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। তিনি অভিযোগ করে বলেন, এখন পর্যন্ত কোনো জনপ্রতিনিধি এলাকা পরিদর্শনে আসেননি। স্থানীয়রাই পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের ঘটনাস্থলে নিয়ে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত অংশ দেখিয়েছেন। তারা ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিলেও এখনো দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। স্থানীয়দের আশঙ্কা, বর্ষার শেষ দিকে অথবা আগামী পূর্ণিমার অস্বাভাবিক জোয়ারে ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ দিয়ে আবারও লোকালয়ে পানি ঢুকে পড়তে পারে। এতে চারটি ইউনিয়নের লক্ষাধিক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি ফসলি জমি, মাছের ঘের, বসতবাড়ি ও গ্রামীণ সড়কের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে। তাই বড় ধরনের বিপর্যয়ের আগেই ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ দ্রুত মেরামতের দাবি জানিয়েছেন তারা। নোয়াখালী পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী জামিল উদ্দিন পাটোয়ারী বলেন, চলতি বছর অস্বাভাবিক জোয়ারের পাশাপাশি অতিবৃষ্টির কারণে নদীতীরবর্তী চারটি ইউনিয়নের প্রায় ৮০০ মিটার বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো পরিদর্শন করে বাস্তব পরিস্থিতির প্রতিবেদন জেলা কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া সাপেক্ষে জরুরি ভিত্তিতে ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ মেরামতের কাজ শুরু করা হবে।